জাতীয়

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সমস্যার মূলে সিএমসি

মোহনা অনলাইন

ঢাকা- আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সমস্যা যেন শেষই হচ্ছে না। একের পর এক অঘটন ও জটিলতায় এই প্রকল্প আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর এই সমস্ত কিছুর মূলে একটি চায়না কোম্পানির নাম ঘুরে ফিরেই সামনে আসছে। নানা তথ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে এর জন্য দায়ী চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এন্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি)।

জানা গেছে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কন্ট্রাক্টর (সিএমসি) এর অবহেলার কারণে চলতি বছরের ২৯শে জানুয়ারি একজন নির্মাণ শ্রমিকের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে। এর পরদিনই প্রকল্পের ডিজাইন রিভিউ কনসালটেন্ট TYPSA কর্তৃক সিএমসি-কে দেওয়া একটি চিঠিতে ঘটনার বেশকিছু কারণ ও অবহেলা স্পষ্ট করা হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্প কাজে যথাযথ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে “একটি বৈদ্যুতিক শক তরঙ্গ আশেপাশের উচ্চ ভোল্টেজের তার থেকে নির্গত হয়েছিল যা কার্যক্ষেত্রের কাছাকাছি ছিল, এটি ছিলো প্রায় ৬.৫ ফুট এর মাঝে। কিন্তু সিএমসি স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা পরিকল্পনায় নির্ধারিত দূরত্ব হলো মিনিমাম ২৫ ফুট।” নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী দূরত্ব কম থাকায় এটিই প্রমাণ হয় যে, সিএমসি-এর ব্যর্থতার কারণে একজন শ্রমিকের দুঃখজনক অকাল মৃত্যু হয়েছে। দূর্ঘটনার জন্য কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। এমনকি স্থানীয় শ্রমিকদের জন্যেও রাখা হয়নি কোন বীমা সুবিধা। যদিও শ্রমিকদের জন্য বীমা সুবিধা থাকাটা ছিলো বাধ্যতামূলক এবং এটা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ-বিবিএ প্রতিটি পেমেন্টে শ্রমিকদের বীমা সুবিধার আওতায় আনতে অর্থ প্রদান করে থাকে। তা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্থানীয় শ্রমিকদের বীমার ব্যবস্থা করে না চায়না কোম্পানি সিএমসি।

গুগল নিউজে ফলো করুন Mohona TV গুগল নিউজে ফলো করুন Mohona TV

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিএমসি যাতে স্থানীয় শ্রমিকদের শোষণ না করে তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) কাজ করা উচিত। চাইনিজ নববর্ষে চীনা কোম্পানিকে ফুল দেওয়ার পরিবর্তে একজন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য বিবিএ-কে অবশ্যই সিএমসি’র প্রতি কঠোর হওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে তারা যাতে শুধুমাত্র লাভের কথা চিন্তা না করে শ্রম আইন ও নিরাপত্তা নির্দেশিকা যাতে অনুসরণ করে তা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। প্রতিটি জীবনেরই মূল্য থাকা উচিত।

জানা গেছে, সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি সিএমসি-এর কাছ থেকে অর্থ সংরক্ষণের জন্য বিবিএ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)কে নির্দেশ দিয়ে একটি রিট পিটিশনের রুল দিয়েছে। আদালত বিবিএকে সংশ্লিষ্ট অংশের জন্য অর্থ সংরক্ষণে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশ কার্যকর করতে বিবিএ গত ৭ই ফেব্রুয়ারি একটি নির্দেশ জারি করে।

অতীত  অভিজ্ঞতা  বিশ্লেষণ করলে জানা যায়,  চাইনিজ কোম্পানি সিএমসির বিরুদ্ধে  অতীতেও অর্থ প্রদান না করার অভিযোগ রয়েছে।  ২০১৮ সালে তারা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) অনুমোদিত কোম্পানি STUP এবং NCME কে ডিজাইন ভিত্তিক রিপোর্ট (DBR) তৈরি করার জন্য নিয়োগ করে। সেই রিপোর্টের বিল পরপর দুইবার ২০১৮ ও ২০২১ সালে লিখিত নোটিশ দেয়া সত্বেও STUP এবং NCME কে ডিজাইনের অর্থ প্রদান করেনি সিএমসি। জানা গেছে, কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে একটি নিয়ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে চাইনিজ কোম্পানি সিএমসি। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বেশ কিছু প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরেও সিএমসিকে সব সময় অভিযোগ থেকে ছাড় দেয়া হয়  এবং তাদের সব রকম সহযোগিতা করা হয়।

জানা গেছে, সিএমসি এই  প্রকল্পের জন্য ডিজাইন এবং পর্যালোচনার পরামর্শদাতা হিসাবে নিযুক্ত TYPSA  কর্তৃক প্রদত্ত কিছু বাধ্যতামূলক নির্দেশ  সম্পূর্ণরূপে অমান্য করেছে। গত বছরের শুরুর দিকে, সিএমসিকে দেয়া TYPSA-এর একটি চিঠি থেকে পাইলের কাজের বড় অসঙ্গতিগুলি দেখতে পাওয়া যায়। একইসাথে তারা নির্দেশগুলো সম্পূর্ণভাবে অমান্য করছে সেই প্রমাণও পাওয়া যায়। TYPSA আরও জানিয়েছে, প্ল্যাটফর্মে যে কেসিং পাইল ছিলো তার মান অনেক বেশি খারাপ ছিলো। এতে আরও বলা হয়: “ঠিকাদারকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল এবং প্ল্যাটফর্ম স্তরে তাদেরকে EGL-এর উপরে কেসিং রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, ঠিকাদার ERA নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করেনি, বরং তারা বোরিং কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে”।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যাগুলি যদি পরীক্ষা করা না হয় এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব সমাধান না করা হয়, তাহলে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। প্রকল্পের সাথে জড়িত বিবিএ এর সংশ্লিষ্ট সকলকে অবশ্যই আরও সচেতন হতে হবে এবং প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করার সময় ঠিকাদারের সাথে একদমই নমনীয় হওয়া যাবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিবিএ এর কিছু কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিভিন্ন রকম সুবিধা ও অনুমোদন পেতে  সিএমসি  অবৈধভাবে একজন  ক্ষমতাধর ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়েছে, যিনি  ছিলেন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন সচিবের বন্ধু। যা এখন বিবিএ-এর স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এমনকি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়োজিত চুক্তি বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি সুলিভান লিখিত ২০১৭ সালের চুক্তি ও টিমের অন্যান্য সদস্যদের নির্দেশের বিরুদ্ধেও গেছে সিএমসি কার্যক্রম।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ সরকারের কখনই উচিত না একটি চায়না রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি থেকে এই ধরনের আচরণ মেনে নেয়া। প্রকল্পের কাজে নিরাপত্তা ও গুণমান বজায় রাখা এবং প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন হয়েছে তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারসহ সমস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে।

উল্লেখ্য, ঢাকার দ্বিতীয় (ঢাকা-আশুলিয়া) এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায় ২০১৭ সালে। ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে প্রকল্পটি। এটি শেষ করার কথা রয়েছে ২০২৬ সালের জুনে।

 

 

 

 

 

 

 

author avatar
Mohona Online
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button